Bangladesh Cricket

১০ হাজার রানের মাইলফলক ছুঁয়েও আক্ষেপ মার্সাল আইয়ুবের: ‘মূল্যায়ন কোথায়?’

প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে বাংলাদেশের চতুর্থ ব্যাটার হিসেবে ১০ হাজার রানের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন মার্সাল আইয়ুব। তবে এই অর্জনের আড়ালে ঘরোয়া ক্রিকেটের অবমূল্যায়ন ও বঞ্চনার চিত্রটিই যেন বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠল অভিজ্ঞ এই ক্রিকেটারের কণ্ঠে।

১০ হাজার রানের মাইলফলক ছুঁয়েও আক্ষেপ মার্সাল আইয়ুবের: ‘মূল্যায়ন কোথায়?’
Marshall Ayub completed 10,000 runs in Frist-class cricket.

উল্লেখ্য: ক্রিক্রেজের সকল সংবাদ উভয় ভাষায় সংরক্ষণের অংশ হিসেবে ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে এই বাংলা সংস্করণটি অনুবাদ করা হয়েছে।

দুই দশক ধরে বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ধারাবাহিকভাবে পারফর্ম করে যাচ্ছেন মার্সাল আইয়ুব। ৩৬ বছর বয়সী এই ব্যাটার এই সপ্তাহে স্পর্শ করলেন ১০ হাজার রানের মাইলফলক। বাংলাদেশের মাত্র চতুর্থ ক্রিকেটার হিসেবে এই কীর্তি গড়লেন তিনি। তবে এক খোলামেলা সাক্ষাৎকারে আইয়ুব জানালেন, মাইলফলকের আনন্দ ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠছে এক গভীর হতাশা—ঘরোয়া ক্রিকেটাররা আজও উপেক্ষিত, অবমূল্যায়িত এবং পারিশ্রমিকের দিক থেকেও বঞ্চিত।

২০০৫ সালের ডিসেম্বরে বয়সভিত্তিক দলের হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হয়েছিল আইয়ুবের। তিনি বলেন, 'তখন আমাদের হাতে খুব বেশি ক্রিকেটার ছিল না। আমাদের অনেককেই অল্প বয়সে সিস্টেমে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। ২০ বছর যে পেরিয়ে গেছে, সেটা ভাবতেই অদ্ভুত লাগে।'

আইয়ুবের মতে, এই দীর্ঘ পথচলায় ফিটনেস ধরে রাখা যেমন কঠিন ছিল, তেমনি লড়াইটা করতে হয়েছে প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, 'আমাদের দেশে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটাররা সেভাবে সম্মান পায় না। এমনকি টেস্ট খেলা ক্রিকেটারদেরও স্বীকৃতি পেতে সংগ্রাম করতে হয়। আমি চেয়েছিলাম এমন কিছু অর্জন করতে, যা নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হবে।'

প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ২৮টি সেঞ্চুরি থাকার পরও তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার সেভাবে ডানা মেলেনি। ২০১৩ সালে খেলেছেন মাত্র তিনটি টেস্ট, যেখানে তাকে খেলানো হয়েছিল তিন নম্বর পজিশনে, যা তার অভ্যস্ত জায়গা নয়। আইয়ুবের আক্ষেপ, 'আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তিন নম্বর পজিশন খুব চ্যালেঞ্জিং। আপনাকে সবকিছু সামলাতে হবে—পেসারদের নতুন বলের শুরুর ধাক্কা কিংবা স্পিনারদের দীর্ঘ স্পেল। আমি মিডল অর্ডারের ব্যাটার হিসেবে মানিয়ে নিয়েছিলাম, কিন্তু আমাকে বলা হলো নতুন বল সামলাতে।'

তিনি মনে করেন, তাকে পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হয়নি। আইয়ুব যোগ করেন, 'সে সময় যারা ছিল, তাদের জিজ্ঞেস করলে বলবে আমাকে যথেষ্ট সুযোগ দেওয়া হয়নি। টানা দুই মৌসুমে হাজার রান করেছিলাম। দল থেকে বাদ পড়ার পরও জাতীয় লিগ ও বিসিএল-এ নিয়মিত রান করেছি, কিন্তু আর ডাক পাইনি। হয়তো নির্বাচকদের মনে হয়েছিল আমি যথেষ্ট ভালো নই।'

সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছেন ঘরোয়া অর্জনের প্রতি বিসিবির উদাসীনতায়। আইয়ুবের ভাষায়, 'গতকাল ১০ হাজার রান পূর্ণ করলাম, অথচ বিসিবির ফেসবুক পেজে আমাদের ছবিই দেওয়া হলো না! পরে তারা ছবি চেয়ে পাঠাল, তারপর পোস্ট করল। একবার ভাবুন, ঘরোয়া ক্রিকেটারদের অবস্থান কোথায়? নতুন খেলোয়াড়রা তো দেখছে যে, জাতীয় দলে সুযোগ না পেলে আপনার কোনো মূল্য নেই।'

কাঠামোগত ঘাটতি নিয়েও কথা বলেছেন আইয়ুব। তার মতে, পর্যাপ্ত অনুশীলনের সুযোগ, ভালো পিচ আর বছরজুড়ে প্রশিক্ষণের অভাব ঘরোয়া ক্রিকেটকে পিছিয়ে দিচ্ছে। তিনি বলেন, 'যারা এইচপি বা এ দলে নেই, তাদের অবস্থা খুব খারাপ। ঢাকায়ও অনুশীলনের জায়গা সীমিত। প্রতিটি বিভাগে অন্তত একটি করে মাঠ থাকা উচিত যেখানে সারা বছর অনুশীলন করা যাবে। আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে হলে পিচের উন্নতি করতেই হবে।'

ম্যাচ সংখ্যা কমে যাওয়া নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি। 'আগে এনসিএলের দুই রাউন্ডে ১০টি ম্যাচ খেলতাম, এখন সাতটি। দুই বছর ধরে বিসিএল নেই। খেলার পরিমাণ না বাড়লে ক্রিকেটাররা শিখবে কীভাবে?'

অবসরের ভাবনার বিষয়ে আইয়ুব জানালেন, তার পরিবার এখনও তাকে মাঠে দেখতে পছন্দ করে। তবে আর্থিক বাস্তবতায় টিকে থাকাটাই বড় চ্যালেঞ্জ। তার কথায়, 'একটি চার দিনের ম্যাচের ফি ৭০ হাজার টাকা, আর টি-টোয়েন্টিতে ৫০ হাজার। ব্যবধানটা খুব সামান্য। লাল বলের ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসার কারণেই আমি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলি। তবে এটাকে টেকসই করতে হলে ফি অন্তত ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বাড়ানো প্রয়োজন।'

আপাতত, বাংলাদেশের ক্রিকেটের এই নিভৃতচারী সৈনিক লড়ে যাচ্ছেন নিজের মতো করেই—রান করে যাচ্ছেন, স্বপ্ন দেখছেন, আর অপেক্ষায় আছেন, কবে সিস্টেম তার এই দীর্ঘ ক্যারিয়ারের মূল্য দেবে।